আপনি কি ইংরেজিতে চিন্তা করেন?
এই লেখায় আমি ইংরেজিতে চিন্তা করার প্রবণতা এবং মাতৃভাষায় জ্ঞান চর্চার গুরুত্ব নিয়ে আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের দৃষ্টিভঙ্গি শেয়ার করেছি। এর পাশাপাশি, ভাষার সাথে আমাদের কালচারাল আইডেন্টিটি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে নিজস্ব সংস্কৃতির পণ্য তুলে ধরার মাধ্যমে কীভাবে কৃত্রিম ডিমান্ড তৈরি করা যায়, সেই ব্যবসায়িক কৌশল নিয়েও আমার চিন্তাভাবনাগুলো তুলে ধরেছি।

গত এক বছর ধরে আমি খুব করে ব্লগ লেখার চেষ্টা করছি৷ একে তো ধারাবাহিকতা রক্ষা করার কোনো নাম নেই, তার উপর যখন চিন্তা করি, তখন চিন্তা করি ইংরেজিতে৷ ইংরেজিতে চিন্তা করে বাংলায় লেখা যায় নাকি!
When I think, I think in English.
"আপনি কি ইংরেজিতে চিন্তা করেন?" এই প্রশ্নটা প্রথম ছুড়ি কয়েকদিন আগে আমার বন্ধু তূর্যর বড় ভাইয়ার কাছে৷ ভাইয়া দীর্ঘ সময় ধরে আমেরিকা থাকেন৷ এতদিন আমেরিকানদের সাথে থেকে নিশ্চয়ই ইংরেজিতে ভাবা শুরু করেছেন৷ ভাইয়াকে প্রশ্ন করে অবশ্য তেমন সন্তোষজনক কোনো উত্তর পাইনাই৷ তবে প্রশ্নটা ভাইয়াকে অবশ্যই ভাবিয়েছে।
ইকোনমিক্সে একটা মজার কথা আছে। আপনার সবচেয়ে কাছের পাঁচজন বন্ধুর অর্থনৈতিক অবস্থার গড় আপনার অর্থনৈতিক অবস্থাকে নির্দেশ করে। ইংরেজিতে আরও সিমপ্লিফাইড একটা প্রবাদ খুব জনপ্রিয়।
You're the average of the FIVE people around you.
আপনার আশেপাশের পাঁচজন মানুষ যদি ইংরেজিতে কথা বলে, আপনারও ইংরেজিতে কথা বলা যেমন স্বাভাবিক, তেমনি তাদের মতো করে ইংরেজিতে চিন্তা করাটাও খুব স্বাভাবিক। ইংরেজিতে চিন্তা চর্চার বৃদ্ধির জন্যই বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এসে প্রায় সব পড়াশোনা হয় ইংরেজিতে। কিন্তু এর কি আদৌ দরকার আছে? আমরা যখন কোনো কিছু লিখবো, তখন বাংলায় না লিখে কেন ইংরেজিতে লিখবো?
আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক এ ব্যাপারে খুব অসন্তুষ্ট। তাঁর মতে পৃথিবীর সব সেরা কোর্স ম্যাটারিয়ালগুলো ইংরেজিতে লেখা। সবচেয়ে সেরা লেকচারগুলো ইংরেজিতে শ্যুট করা। তিনি মনে করেন, বাঙালি হিসেবে আমাদের বাংলাতেই কোর্স ম্যাটারিয়ালগুলো তৈরি করা উচিত। কারণ তাঁর মতে একজন বাংলা ভাষাভাষী কোনো কিছু বাংলায় শিখলে তার জন্যে ঐ বিষয়টা আত্মস্থ করা সহজ হবে এবং মস্তিষ্ক প্রতি মুহূর্তে অনুবাদ করতে যে সময়টুকু নিচ্ছে, বাংলায় জ্ঞান চর্চা করলে সেই সময়টুকু অনুবাদ না করে সরাসরি মূল জ্ঞান চর্চায় কাজে লাগাতে পারবে। তিনি আরও মনে করেন, ইংরেজি জানা শুধুই একটা স্কিল, এটা কারও স্মার্টনেস এর পরিচায়ক না। তাই বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে কোর্স ম্যাটারিয়ালগুলো বাংলায় অনুবাদ করা একান্ত প্রয়োজন এবং এ জন্যে পৃষ্ঠপোষকতাও থাকা দরকার।
স্যারের কথাগুলো শুনে আমার এতই ভালো লেগেছে, একদিন কলাভবনের সামনে স্যারকে পেয়ে ধরে বসলাম। স্যারকে বললাম, আমাদের জন্য আপনার বিষয়ের উপর বাংলায় ভিডিও লেকচার সিরিজ বানান, যত ধরণের টেকনিকাল সাহায্য দরকার আমি দিতে প্রস্তুত আছি। স্যার তাঁর ব্যস্ততার অযুহাত দিয়ে যত ভাবে সম্ভব বিষয়টা এড়িয়ে গেলেন। তবে আশা দিয়ে বললেন, ভবিষ্যতে তিনি হয়ত বানাবেন। আমাদের তাঁর বাংলায় লেকচার সিরিজ দেখা আপাতত আর হলো না।
ইংরেজিতে চিন্তা করা একটা অসাধারণ স্কিল, তবে ইংরেজি চর্চা আপনার নিজস্বতায় এবং আত্মপরিচয়ে মিশ্রতা এনে দেয়। কেউ যদি কোনো দেশের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে চান, সবার আগে তিনি সেদেশের ভাষা রপ্ত করার চেষ্টা করেন। কারণ কোনো দেশের বা জাতির সংস্কৃতির সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ভাষা। ব্যবসা বাণিজ্যে নিজের প্রভাব বাড়ানোর ক্ষেত্রে তাই নিজ ভাষার ব্যবহার সবচেয়ে কার্যকর টুল বলে আমি মনে করি।
আপনি যদি আন্তর্জাতিক বাজারে মেয়েদের টপস বিক্রি করতে চান, সেক্ষেত্রে প্রথমদিকে ব্যবসা শুরু করা বেশ সহজ… কারণ ইংরেজ সংস্কৃতির সাথে পুরো বিশ্ব অনেকটা ফ্যামিলিয়ার। যেটাকে আমরা ওয়েস্টার্ণ কালচার বলি। তবে এ স্ট্রাটেজিতে বাজারে আপনার প্রচুর প্রতিযোগী থাকবে এবং কিছুদিন পর স্বাভাবিক উপায়ে ব্যবসা স্কেল করা প্রায় অসম্ভব হয়ে যাবে। অন্যদিকে আপনি যদি আন্তর্জাতিক বাজারে শাড়ি বিক্রি করতে চান, প্রথম পর্যায়ে বাজারে ক্রেতার অভাব থাকলেও শাড়ির পাশাপাশি বাংলা সংস্কৃতিকে যদি টার্গেটেড খদ্দেরের কাছে তুলে ধরা যায়, আন্তর্জাতিক বাজারে স্বাভাবিকভাবে বাঙালি পণ্যের জন্য একটা কৃত্রিম ডিমান্ড তৈরি হবে, শাড়িসহ অন্যান্য বাঙালি পণ্যের জন্য। বেশি বেশি ইংরেজি চর্চা করার মাধ্যমে আমরা নিজ উদ্যোগে ওয়েস্টার্নদের ঠিক এই কাজটাই করে দিচ্ছি।