কেন পড়া ভুলে যাই? মনে রাখার ৪টি বৈজ্ঞানিক উপায়

মূল সারাংশ

এই লেখায় আমি আমাদের পড়া ভুলে যাওয়ার বৈজ্ঞানিক কারণগুলো বিশ্লেষণ করেছি এবং হাইলাইট করা বা বারবার রিডিং পড়ার মতো প্রচলিত অকার্যকর পদ্ধতির সীমাবদ্ধতাগুলো নিয়ে আলোচনা করেছি। এর পাশাপাশি, দীর্ঘকাল পড়া মনে রাখার জন্য ক্লাস নোটের গুরুত্ব, স্পাইডার ডায়াগ্রাম, ফেইনম্যান থিওরি এবং এক্টিভ রিকল ও স্পেসড রিপিটিশন ব্যবহার করে কীভাবে একটি নিজস্ব স্টাডি সিস্টেম তৈরি করা যায়, তার বিস্তারিত ধাপ শেয়ার করেছি।

আগে জানা যাক, কেন পড়া ভুলে যাই

২০১৩ সালের কেন্ট স্টেট ইউনিভার্সিটির এক স্টাডিতে প্রচলিত পদ্ধতিগুলোর মধ্যে—(১) দাগানো এবং হাইলাইট করা, (২) সারাংশ লেখা, (৩) বারবার পড়া বা রিভিশন দেওয়াকে সবচেয়ে অকার্যকর প্রমাণ করেছে। যদিও আমি এখনো বিশ্বাস করি, হাইলাইট করা কিংবা বই দাগানোর মতো পদ্ধতি আসলেই কাজে দেয়। তা ছাড়া, ভার্সিটি আর ভর্তি পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া শিক্ষার্থীরা তো বছরের পর বছর ধরে বই হাইলাইট করার মতো বিষয়কে বেশ গুরুত্বের সাথে করে আসছে। আমি নিজেও অনেককে দেখেছি নোট না করেও শুধু বই দাগিয়ে আশানুরূপ ফল পেয়েছে। তাহলে কেস স্টাডিটায় কি সব অমূলক তথ্য উঠে এসেছে? না।

"These techniques were rated as low utility for numerous reasons. Summarization and imagery use for text learning have been shown to help some students on some criterion tasks, yet the conditions under which these techniques produce benefits are limited, and much research is still needed to fully explore their overall effectiveness. The keyword mnemonic is difficult to implement in some contexts, and it appears to benefit students for a limited number of materials and for short retention intervals. Most students report rereading and highlighting, yet these techniques do not consistently boost students’ performance, so other techniques should be used in their place (e.g., practice testing instead of rereading)."

তাদের মতে, নেমোনিক ব্যবহার করা কিংবা পরীক্ষার আগে আগে কম সময়ে বেশি করে পড়া- যাকে 'ক্র্যামিং' বলে (ঘটনা ৩-এ রাফিও এই কাজ করেছে), এসব বিষয় কিছুটা সময়ের জন্য ভালো ফল দিলেও প্রকৃতপক্ষে শিক্ষার্থীদের কোনো পারফরম্যান্স বাড়াতে ভূমিকা রাখে না। তা ছাড়া 'ফরগেটিং কার্ভ' বা ভুলে যাওয়ার লেখচিত্র বলে একটা বিষয় আছে।

এই থিওরি অনুসারে, আমাদের মস্তিষ্ক প্রথমবার পড়া/জানা/শোনা যেকোনো বিষয় শুধুমাত্র গোটা দিনকয়েক মনে রাখতে পারে। এরপর একটু গ্যাপ দিয়ে একই বিষয় আরেকবার মনে করার মাধ্যমে একটু রিনিউ করে নেওয়ার দরকার হয়। এক্ষেত্রে কোনো বিষয় একটা নির্দিষ্ট সময় পরপর যতবার রিভিউ করব, ঐ বিষয়টি মনে রাখার ক্ষমতা দিনকে দিন ততটাই বেড়ে চলবে। মনে রাখার এই ক্ষমতাটা বেশ কয়েকভাবে বাড়ানো যায়। কোনো হুজুরের পানি-পড়া নেই, কোনো শর্টকাটও নেই। তবে চাইলে সঠিক পর্যায়ক্রম অনুসরণ ও দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে কম সময়ে ও কম কষ্টে বেশি বেশি পড়া মনে রাখা সম্ভব। (ধাপ-৪-এ বিস্তারিত লিখেছি)।

তাহলে ঠিক কোন নিয়মগুলো কার্যকর এবং ঠিক কোনটা ফলো করা উচিত?

এ প্রশ্নের জবাব বেশ কয়েকভাবে দেওয়া যায়। তবে সবার আগে ঠিকভাবে জানতে হবে আমি কী বিষয় শিখতে চাচ্ছি। মেমোরাইজেশন কিংবা মুখস্থ করে পড়া মনে রাখা সব একাডেমিক সাবজেক্টের জন্য একদমই জরুরি না। ম্যাথ, ফিজিক্স, আইসিটির মতো বিষয়গুলো হুবহু মুখস্থ করার দরকার না হলেও বায়োলজি, ইংরেজি, রসায়ন ইত্যাদি বিষয়ে ভালো করতে চাইলে বুঝে পড়ার পাশাপাশি মুখস্থ করার দক্ষতা তৈরি করা জরুরি।

আমি নিজেও একজন ভর্তি-পরীক্ষার্থী এবং গত কয়েক সপ্তাহ যাবৎ আমি ২০১৩ থেকে ২০১৭-এর বেশ কয়েকটা আলোচিত স্টাডি নিয়ে বিভিন্ন আর্টিকেল পড়া, লেকচার দেখা ও বিভিন্ন ব্যক্তির অভিজ্ঞতা ঘাঁটাঘাঁটি করার পাশাপাশি নিজের জীবনেও প্রয়োগ করার চেষ্টা করেছি।

নিচে কোন কোন টেকনিকগুলো পড়া মুখস্থ করতে ও তা অনেক দিন মনে রাখতে কার্যকর, তার পর্যায়ক্রমিক বর্ণনা দিলাম:

ধাপ ১: বাধ্যতামূলক ক্লাসের লেকচার নোট

পড়া বেশিদিন মনে রাখতে চাইলে প্রথমে অবশ্যই তা ঠিকমতো বুঝে নিতে হবে। বিশেষ করে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের পর বিষয়গুলোতে শিক্ষকদের লেকচারগুলো অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আমি কলেজে যে বিষয় ও অধ্যায়গুলোর লেকচার সহজ ভেবে অবহেলা করেছি, এখন সেই অধ্যায়গুলোতে অনেক বেশি সময় দিতে হচ্ছে। ক্লাসে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের দেওয়া লেকচারগুলো যেমন মনোযোগ সহকারে শোনা জরুরি, পাশাপাশি নোট করাটাও অনেক গুরুত্বপূর্ণ।

অনেকের অবশ্য প্রায়ই ক্লাস নোট হারিয়ে যায় কিংবা বাসায় তেমন একটা নোট খাতা খুলে দেখা হয় না (হয়তো বই অনুসরণ করে, তাই)। আমি বলব, তাদের ক্ষেত্রেও ক্লাসে নোট করাটা সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আসলে নোট করে তা থেকে পরবর্তীতে রিভিউ করার চেয়ে নোট করার প্রসেসটাই বেশি কাজে দেয়। নোট করতে হলে কিছুটা বাধ্য হয়েই ক্লাসের লেকচারে মনোযোগ রাখতে হয়। ফলস্বরূপ ক্লাসে আরও অ্যাক্টিভ থাকা যায় এবং লম্বা ক্লাসগুলোয় নিজেকে ব্যস্ত রাখার মাধ্যমে একঘেয়েমিও কাটানো যায়।

ধাপ ২: স্পাইডার ডায়াগ্রামের দ্বারা ব্রেইন ম্যাপিং

কোনো অধ্যায়ের লেকচার মনোযোগ সহকারে দেখার পর ঐ বিষয়টা ভালোভাবে নিজের মতো অনুধাবন করার জন্য অন্তত একবার পুরোটা রিডিং দিতে হবে। তবে তার আগে আমাদের সবার উচিত নিজের মাথায় পুরো অধ্যায়ের একটা ছোটোখাটো নকশা সাজিয়ে ফেলা। আমি নিজেও দেখেছি, এটা বেশ ফলদায়ক টেকনিক। পড়ার শুরুর পূর্বে অল্প সময় নিয়ে পুরো অধ্যায়ের 'ওভারভিউ' নিতে সাহায্য করবে স্পাইডার ডায়াগ্রাম। পদ্ধতিটা বেশ সহজ। একটা সাদা পৃষ্ঠা নিয়ে সেখানে ঐ অধ্যায়ের মূল বিষয় এবং যত শাখা-প্রশাখা আছে, সব সংক্ষেপে লিখে ফেলতে হবে। রিডিং দেওয়ার পূর্বে ঐ অধ্যায়ের বেসিক স্পাইডার ডায়াগ্রাম করে নিলে অধ্যায়টা বুঝে পড়া এবং মুখস্থ করা অনেকখানি সহজ হয়ে যাবে।

ধাপ ৩: পড়ার ক্ষেত্রে অনুসরণ করবেন ফেইনম্যান থিওরি এখন আসি কীভাবে কোনো বিষয় নিজে থেকে পড়তে হবে এবং কীভাবে পড়লে বেশিদিন সেটা মনে থাকবে, সেই কথায়। যেকোনো বিষয় ভালোভাবে বুঝে পড়ার জন্য বিজ্ঞানী ফেইনম্যানের অসাধারণ এক টেকনিক আছে। এই থিওরি অনুসারে, কোনো বিষয় তখনই ভালোভাবে অনুধাবন করতে পেরেছি বুঝব, যখন বিষয়টা যত কঠিনই হোক না কেন, মাত্র বারো বছরের একজন বাচ্চাকে সহজভাবে বুঝিয়ে বলতে পারব।

এই টেকনিকটা ফলো করতে গিয়ে সত্যি সত্যি ১২ বছরের শিশু জোগাড় করার দরকার নেই। নিজেকে নিজে বোঝানোর চেষ্টা করলেও হবে। মূল উদ্দেশ্য হলো পুরো বিষয়/অধ্যায় সম্পর্কে সম্পূর্ণ দক্ষতা তৈরি করা।

ধাপ ৪: অ্যাক্টিভ রিকল ও স্পেসড রিপিটিশন

নোট নেওয়া থেকে শুরু করে স্পাইডার ডায়াগ্রাম ব্যবহার করে কোনো বিষয় গভীরভাবে অনুধাবন করার পর এবং সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ করে বুঝে বুঝে মুখস্থ করার পরও সময়ের সাথে সাথে ঐ বিষয়টা ভুলে যাব—এটাই স্বাভাবিক। আগেও বলেছি, "দ্য ফরগেটিং কার্ভ" নামে একটা বিষয় আছে এবং এ অনুসারে আমাদের মস্তিষ্ক যতবার কোনো বিষয় নিজে থেকে মনে করার চেষ্টা করে, তত বেশিদিন ঐ বিষয় সম্পর্কে মনে রাখতে পারে।

মানুষের যেকোনো বিষয় প্রথমবার শোনা/পড়া/জানার পর পরবর্তী কিছুদিনের মধ্যে ভুলে যাওয়ার প্রবণতা থাকলেও, বেশ কয়েকবার অ্যাক্টিভলি রিকল বা নিজে স্মরণ করার মাধ্যমে স্মৃতিতে পড়া ধরে রাখার সময়টাকে বাড়িয়ে নিতে পারে। পুরো ব্যাপারটার সাথে যেহেতু ব্রেইনে থাকা নিউরন কোষগুলো সম্পর্কিত, তাই একই বিষয় বারবার রিডিং না পড়ে বরং বারবার নিজে থেকে স্মরণের চেষ্টা করার মাধ্যমে ব্রেইনের ঐ অংশের নিউরন কোষগুলোর মধ্যে সংযোগক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। একটা নির্দিষ্ট সময়ের প্যাটার্ন ফলো করে কিছুদিন পরপর (স্পেসড রিপিটিশন) কয়েকবার রিকল করার মাধ্যমে ঐ বিষয়/অধ্যায় সম্পর্কে যাবতীয় কিছু অনেকদিন ধরে মনে রাখা সম্ভব।

'অ্যাক্টিভ রিকল' ও 'স্পেসড রিপিটিশন'—দুটো টেকনিক সম্পূর্ণ আলাদা হলেও আমি এ দুটি টেকনিক একসাথে সমন্বয় করে অনুসরণ করার চেষ্টা করি। অ্যাক্টিভ রিকলের জন্য ফ্ল্যাশকার্ড ব্যবহার একটা কার্যকরী ও জনপ্রিয় টেকনিক। ফ্ল্যাশকার্ড নিয়ে আজ আর কিছু লিখব না। ফ্ল্যাশকার্ড বানাবেন ভিজিটিং কার্ডের স্টাইলে, তার একপাশে প্রশ্ন লিখবেন, অন্য পাশে উত্তর। ....

সবশেষে

অ্যাক্টিভ রিকল ও স্পেসড রিপিটিশন পদ্ধতি অনুসরণ করে পড়ার জন্য নিজের মতো একটা স্প্রেডশিট ডকুমেন্ট বা কাগজে-কলমে ছক করে ফেলতে পারেন। সেখানে আপনার পড়ার সব বিষয়গুলো লিখে কোন বিষয় কখন পড়ছেন, তা নোট ডাউন করে রাখবেন। যে বিষয়গুলো বেশ কয়েকদিন আগে পড়া হয়েছে (১-৩ সপ্তাহ) এবং যে বিষয়গুলো একটু কঠিন লাগছে, সেগুলো ছক দেখে দেখে এক এক করে রিভিশন দিয়ে ফেলবেন। আমিও এভাবেই পড়ি।

তবে রিভিশন দেওয়ার ক্ষেত্রে অবশ্যই নিজেকে প্রশ্ন করে করে উত্তর দিয়ে—এভাবে এগোতে হবে। বইয়ের লাইন ধরে ধরে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সবকিছু রিডিং পড়ে গেলে কোনো লাভ হবে না। আর এই অকাজটাই আমরা সবচেয়ে বেশি করি।