লাইব্রেরিতে গিয়ে কেন পড়বো?
এই লেখায় আমি বাসায় বসে কাজ করার বদলে মেডিকেল কলেজের লাইব্রেরিতে গিয়ে পড়ার এক ভিন্নধর্মী প্রোডাক্টিভিটি হ্যাক শেয়ার করেছি। পাবলিক প্লেসে কাজ করলে কেন ফোকাস বাড়ে, তার সাইকোলজিক্যাল কারণগুলো ব্যাখ্যার পাশাপাশি, দিনের শুরুতে কাজের প্ল্যানিং করার গুরুত্ব এবং বরিশালের পাবলিক লাইব্রেরিগুলোর বর্তমান অবস্থা নিয়েও আমার চিন্তাভাবনা তুলে ধরেছি।

নিজ বাসা আমার কাছে সম্পূর্ণ এক আরামদায়ক জায়গা। শুধু আমার ক্ষেত্রে না, সবার জন্যই বাসা-বাড়ি এক প্রকার কম্ফোর্ট জোন হিসেবে কাজ করে। তাই বাসায় বসে অকাজ করতে চাইলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে করা যায়। কিন্তু জীবনের উন্নতিতে কাজে আসবে এমন কোনো কাজ করতে গেলেই কেন যেন ঘুম পায়। তখন রান্নাঘরে গিয়ে আম্মুর খোঁজখবর নিতে ইচ্ছা করে, চায়ের প্যাকেট শেষ হয়ে যায়, দুধওয়ালা দুধ দিতে আসে, আরও কত কী!
লাইব্রেরিতে অবশ্য এরকম কিছু নেই। তার চেয়ে বড় কথা—আমি যে লাইব্রেরিতে যাই, সেটা একটা মেডিকেল কলেজের লাইব্রেরি (লাইব্রেরি না বলে বরং স্টাডি রুম বললে বেশি সঠিক হবে)। লাইব্রেরিটা কলেজের একদম প্রশাসনিক (প্রধান) ভবনের দোতলায়, সেখানে কাউকেই সেভাবে চিনি না। সাধারণ একজন শিক্ষার্থী হয়ে মেডিকেল কলেজের লাইব্রেরিতে যাওয়াটা কতটা দুঃসাহসিক ব্যাপার ঠিক জানি না, তবে মাসখানেক ধরে সপ্তাহে ছয় দিন, প্রতিদিন সকাল ৯টায় শার্ট-প্যান্ট পরে একদম পরিপাটি হয়ে সেখানে যাই, ফিরি রাত ১০টায়। মাঝে শুধু দুপুরের খাবার এবং সন্ধ্যায় নাশতার ব্রেক। তা-ও সেখানকার ক্যান্টিনেই। দিনের একটা লম্বা অংশ জুড়ে অপরিচিত মানুষের আশেপাশে থেকে একজন ইম্পোস্টরের মতো চুপচাপ থাকি বিধায় অনেক বেশি পড়া যায় (শুধু পড়া যায় বললে অবশ্য ভুল হবে, পড়তে বাধ্য হই)।
আপনি কেন লাইব্রেরিতে গিয়ে পড়বেন, এই প্রশ্নের উত্তরও বেশ সুন্দরভাবে দেওয়া যায়। তবে লেখার আকার ছোট রাখতে আমি শুধু পয়েন্ট আকারে সংক্ষেপে বলছি—
- আপনার নিজের বিছানা থেকে আপনি অনেক দূরে আছেন। তাই চাইলেই যেকোনো সময় আপনি আধা ঘণ্টা শুয়ে বিশ্রাম নিতে পারবেন না। যেকোনো প্রকার আলসেমির সুযোগ পাবেন না বললেই চলে।
- লাইব্রেরি কিংবা যেকোনো পাবলিক প্লেসে আপনি কী করছেন, এটা নিয়ে কখনোই কেউ মাথা ঘামাবে না; তারপরও আশেপাশে অনেক অপরিচিত মানুষ থাকায় আপনার মনে হবে কেউ হয়তো আপনাকে দেখছে। এই ভাবনা থেকেই আপনি নিজেকে অপ্রয়োজনীয় কাজ করা থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করবেন। ব্যাপারটা কিন্তু বেশ কাজে দেয়। “কেউ দেখছে” এই ভীতির কারণেই আমাদের ফোকাস বহুগুণে বেড়ে যায়, যার কারণে লম্বা সময় ধরে বিরতিহীনভাবে কাজ করা অনেকটা সহজ হয়ে আসে। ঠিক এভাবেই হ্যারি পটার সিরিজের লেখিকা জে. কে. রাওলিং-ও তাঁর বইগুলো বেশিরভাগ সময় লিখেছেন বিভিন্ন ক্যাফেতে বসে।
- আপনি কিছু টাকা আর ২০-৩০ মিনিট সময় খরচ করে এখানে এসেছেন। এতদূর এসে আরও সময় নষ্ট করার মানেই হয় না। তাই খানিকটা বাধ্য হয়েই আপনাকে মনোযোগ দিতে হবে।
- আপনি চাইলেই এখানের ফ্রিজ খুলে দেখতে পারবেন না—খাওয়ার মতো কিছু আছে কি না। অন্যের অসুবিধা হতে পারে ভেবে অপ্রয়োজনীয় ফোনালাপ থেকেও বিরত থাকবেন, আশেপাশে গল্প করার মতোও চেনা কেউ নেই। বাধ্য হয়ে পড়তেই হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, লাইব্রেরিতে গেলে ঐদিন কী কী কাজ বা পড়া শেষ করবেন, তা আগে থেকে প্রস্তুতি বা প্ল্যানিং করে যান বিধায় একটা উদ্দেশ্য তৈরি হয়। দিনশেষে আপনি কতটা প্রোডাক্টিভ থাকতে পারছেন, তা ঐ দিনে তৈরি হওয়া উদ্দেশ্যটা কতখানি পূরণ হলো তার ওপর নির্ভর করে।
লম্বা সময় থাকার উদ্দেশ্য নিয়ে লাইব্রেরিতে যাওয়ার জন্য সকাল সকাল উঠে খেয়েদেয়ে, ঐ দিন কী কী করব তা সবকিছু গুছিয়ে এবং প্রোপার প্ল্যানিং করে যে পূর্বপ্রস্তুতি নেওয়ার প্রয়োজন পড়ে, পুরো ব্যাপারটা ঐদিনের কাজের একটা purpose তৈরি করে। যা ঐদিন আমাকে নির্দিষ্ট কাজে মনোনিবেশ করতে আরও বেশি ড্রাইভ করে। আশা করি আপনাকেও করবে।
লাইব্রেরিতে যাওয়ার অভ্যাস করলে যেমন কম সময়ে বেশি কাজ গুছিয়ে করে ফেলা যায়, পাশাপাশি লম্বা সময় ফোকাসড থাকার জন্যও লাইব্রেরির মতো নিরিবিলি আর শান্ত জায়গার কোনো বিকল্প নেই।
ঢাকার মতো বরিশালেও ভালো পাবলিক লাইব্রেরি তেমন নেই, মাত্র হাতে গোনা কয়েকটা। যা-ও আছে, তা নিয়ে গর্ব করার মতো কোনো অবস্থা আছে বলে মনে হয় না। বরিশালের বিভাগীয় পাবলিক লাইব্রেরির কথা অবশ্য আজকাল বেশ শুনছি। ব্রজমোহন কলেজের পাশেই। বাইরে থেকে দেখতেও খুবই সুন্দর! সময় সুযোগ হলে সেখানেও একদিন ঢুঁ মেরে আসব।